ভাঙ্গা একটি পেন্ডুলামের আঘাতে জেগে উঠলাম। চোখ মেলে দেখি জায়গাটা অচেনা। উঠে দাড়ালাম। চারেপাশে অসংখ্য ফ্যানের ভাঙা পাখা পড়ে আছে। আকাশে তাকিয়ে বুঝার উপায় নেই এখন সন্ধ্যা না ভোর বেলা। এখানে আকাশ বলতে কিচ্ছু নেই। আছে আকাশের মত বিশাল এক শূন্যতা। একটু হেটে সামনে এগুতেই দেখি এক লোক দাঁড়িয়ে গলা চুলকাচ্ছে। তাকে অনেকটা সময় চিৎকার করে ডাকাডাকি করলাম কোনো সাড়া দিলো না। লোকটা আজব ধরনের বলে তার কাছে যাবার সাহস করিনি। কিছুদূর হেটে দেখতে পেলাম একটি সমুদ্র তীড়। পুরো সমুদ্রের পানি কুচকুচে কালো অথচ আশে পাশে সমুদ্র দুষনের কোনো কলকারখানা নেই। বসে পড়লাম সমুদ্র তীড়ে। ঢেউ গুলো অদ্ভুত। তীরে আছড়ে না পড়ে ঢেউ গুলো সুমুদ্রের মাঝখানে গিয়ে আছড়ে পড়ে। কালো পানির সমুদ্র আছে বলে কক্ষনও শুনিনি।
চমকে উঠি। কে যেনো আমার পিঠে হাত রাখলো। পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখি লম্বা ধরনের এক ভদ্রলোক। আমাকে জিজ্ঞাসা করলো নতুন এসেছি কিনা। আমি উত্তর দেবার আগেই বললো “আস্তে আস্তে এখানে জনসংখ্যা বাড়ছে, এখানে রাত নেই দিন নেই সব সময় সন্ধ্যা হয়ে থাকে। এখানে সময় থেমে থাকে। ঘড়ির মূল্য এ জায়গায় নেই। এখানে অতীত নেই ভবিষ্যৎ নেই শুধু আছে বর্তমান। এই বলে লোকটা গলা চুলকাতে চুলকাতে চলে গেলো।”

হাটছি।জায়গাটা আমার খুব পছন্দ হলো।মনে মনে নাম দিলাম জায়গাটির সন্ধ্যানগরী। হাটছি আর যাকেই দেখছি যে যার জায়গায় দাড়িয়ে কেউ গলা চুলকাচ্ছে কেউ পেট কেউ মাথা। কিছুদূর গিয়ে একটি গেইট দেখতে পেলাম। গেটের ওপাশে যাবার কালে দাড়োয়ান বললো সেখানে যাবার অনুমুতি আছে তবে ভোর হবার আগেই ফিরে আসতে হবে। বেরিয়ে পড়লাম গেটের ওপাশে।

গেটের ওপাশে যে শহর সেখানে এখন রাত। মানুষ এখনো ঘুমোয়নি। ব্যস্ত শহর এখনো। কিছু দোকান পাট এখনো খোলা কিছু দোকানের সাটার মাত্র নামাচ্ছে। সাটার বন্ধ করার শব্দে ঘুমন্ত কুকুর গুলো চমকে উঠছে। সন্ধ্যানগরীর মানুষেরা যেমন চুপচাপ কারো মুখে হাসি নেই আবার কান্নাও নেই। এখানে এসে দেখি কেউ হাসছে কেউ কাঁদছে। হাটতে হাটতে আমার বাসাটা খুজে পেলাম। দরজা বন্ধ থাকলেও আমার ঢুকে পড়তে মোটেও অসুবিধা হয়নি। দেখি বাবা মা আর ভাই ছাড়া সবার চোখে মুখে কেমন যেনো একটি ব্যস্ততার ছাপ। আমার বাবা মা কোরান তিলাওয়াত করছে। সবাইকে চিৎকার করে ডাকাডাকি করলাম। কেউ শুনলোনা আমার ডাক।অথচ তাদের পাশেই আমি দাঁড়ানো। ঢুকে পড়লাম আমার ঘরে। আরেহ!! সব কিছুইতো আগের মতই আছে!! প্যান্টে এখনো বেল্ট টা লাগানো। আমার অর্ধেক খাওয়া কোকাকোলার বোতলটায় এখনো সেই অর্ধেকটা কোক আছে। কম্পিউটারের টেবিলে আমার খাওয়া চায়ের কাপটায় এখনো লিকার জমে আছে। আমার ক্যামেরাটা এখনো বিছানার উপরে পড়ে আছে। আহা! এটা দিয়ে কতইনা ছবি তুলতাম!!! পাশের রুমে গিয়ে দেখি কিছু মানুষ আমাকে নিয়ে কথা বার্তা বলছে। তাদের কথায় আমার প্রতি ভালোবাসা উপচে পড়ছে। অথচ এই মানুষ গুলো দুদিন আগেও আমার সমালোচনায় মগ্ন থাকতো।

কেউ আমার ডাকে সাড়া না দেয়ায় হতাশ হয়ে বেরিয়ে গেলাম আমার বাসা থেকে। ঘুরতে ঘুরতে আরেকটি বাসায় ঢুকে পড়লাম। বিছানায় একটি মেয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলছে। আরে হ্যা চিনতে পেরেছি তাকে। ফোন রেখে বিছানার এপাশ ওপাশ করছে আর একা একা মুচকি হাসছে। নিশ্চই প্রেমে পড়েছে সে! অনেক ডাকাডাকি করলাম। শুনলোনা। মেয়েটাকে আমি খুব ভালোবাসতাম। আমি যেদিন ওর প্রেমে পড়ি আমিও এমনটা বিছানায় এপাশ ওপাশ করতাম। ঘুম আসতো না। একা একা হাসতাম।

ভোর হতে এখনো অনেক দেরি। ফিরে এলাম আবার সন্ধ্যা নগরীতে। নগরীর একটা জায়গায় গিয়ে দেখতে পেলাম একটি থীম পার্কের মত। বেশ কিছু রাইড আছে এখানে। কিন্তু রাইড গুলো খুব আজব। বাতাসে একটি ফ্যান ঝুলছে। ফ্যানের চারটি পাখায় ৪ জন মানুষের গলা দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকে। ফ্যান টা ঘুরে তারাও ঘুরে। আরেকটি রাইড দেখলাম একটি ট্রেইন। অথচ কেউ ট্রনের ভিতরে বসেনা। সবাই দল বেঁধে রেল লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে ট্রেনটা এসে তাদের চাপা দিয়ে চলে যায়। তারপরে আবারো নতুন একটি দল আসে।আরেকটা জিনিস দেখলাম মানুষ দল বেঁধে এক লোকের কাছে যায় সেই লোক টা সবার বুকে গুলি করে ঝাঝরা করে দেয়। তারপরে আবারো আরেকদল আসে গুলি খেতে । আমি এসব দেখে দাঁড়িয়ে থাকা এক লোক কে জিজ্ঞাসা করলাম এসব হচ্ছেটা কি সব এমন কেনো এ নগরীতে। লোকটা বললো “এ নগরীতে যারা আছে সবার মৃত্যু হয়েছে তবে কারো স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। কেউ আত্বহত্যা করেছে ফ্যানে ঝুলে ফাঁসি দিয়ে কেউ ট্রেনের নিচে পড়ে। আবার কেউ খুন হয়েছে। নতুন এসেছিস আস্তে আস্তে সবই বুঝতে পারবি” এসব শুনে আমিও বুঝতে পারলাম গতকালই আমারো মৃত্যু হয়েছে। তারপরে লোকটাকে জিজ্ঞাসা করলাম সবাই গলা মাথা পেট এসব চুলকাচ্ছে কেনো? আর আমিতো আত্বহত্যা করিনি আমাকে কেউ খুনো করেনি আমি কেনো এ নগরীতে?
লোকটা বিরক্ত হয়ে জবাব দিলো “যে লোক যে জায়গায় আঘাত পেয়ে অথবা নিজেকে আঘাত করে মৃত্যুকে বরণ করেছে তারা সবাই সে জায়গায় চুলকায়। আর তুই এখানে কারন তুই আত্বহত্যা কিংবা খুন না হলেও তোর অপমৃত্যু হয়েছে। পৃথিবীর যাবতীয় যন্ত্রনা তোর মস্তিষ্ক নিতে পারেনি।

লোকটার কথা শেষ না করতেই আমি সেখান থেকে সরে গেলাম। হেটে বেড়াচ্ছি আর আমার সব কিছু মনে পড়ছে। আজ আমার হাতে কোনো কাজ নেই। অনন্তকাল অফুরন্ত সময় আমার। আজ আমার মৃত্যুর পরের দিন। আমার মৃত্যুর আগেরদিনও পৃথিবীর একটি মানুষও আমাকে নিয়ে ভাবেনি। পৃথিবীতে সবাই সবাই সবার ছিলো অথচ আমাকে কেউ ছিলোনা। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আর যাবোনা ঐ গেটের ওপাশে জীবিত মানুষের নগরীতে।
সব সুখ মনে হয় এ সন্ধ্যা নগরীতে। এখানে কেউ কাউকে ভালবাসেনা এখানে কেউ কারো না। কেউ কারো হতেও চায়না। ভালোবাসা সন্ধ্যানগরীতে একটি অসুখ…………………..