এর আগে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের অসুস্থতার জন্য অনেক হাসপাতালে থাকার অভিজ্ঞতা হলেও ডকুমেন্টেশনের জন্য মানসিক হাসপাতালে যাবার অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা। অন্য হাসপাতালের চেয়ে এ হাসপাতালের রোগীদের প্রধান পার্থক্য হচ্ছে অন্য হাসপাতালের রোগীরা বেশির ভাগ সময়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকে কিন্তু মানসিক হাসপাতালের রোগীরা সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকেনা। তারা আপন মনে তাদের ওয়ার্ডে বিচরন করে থাকে এবং যখন ইচ্ছা নিজ নিজ বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নেয়।

প্রথমদিন আমি শুধু রোগীদের সাথে গিয়ে কথা বলি। তাদের গল্প শুনি। তাদের গল্প গুলো এতটাই করুণ তাদের গল্প বলার ধরনটা এতটাই করুন যে চোখের পানি আটকে রাখা কষ্টকর। কেউ প্রেমে ব্যর্থ, কেউ ব্যবসায় লোকসানের সম্মুক্ষীন হয়ে, কেউ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে সব হারিয়ে, কেউ অতিমাত্রায় মাদক নিয়ে , কেউ মাথায় আঘাত প্রাপ্ত হয়ে, এমনকি এমনও একজনকে দেখি সে সিনেমা বানাতে না পেরে মানসিক হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়েছে। পরকিয়া করে স্ত্রী কিংবা স্বামী অন্যের হাত ধরে চলে যাবার কারনে মানসিক রোগী হয়ে যাবার ঘটনাও আছে। আছে পরিবারের আপনজনকে হারিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা মানুষ, এমনকি আছে একেবারে সুস্থ মানুষও! এরকম অনেক রোগী আছে যাদের পরিবার মানসিক হাসপাতালে রেখে গিয়েছে অনেক বছর আগে তারপরে আর কোনোদিন খোঁজ নেয়নি। যাবার বেলায় ভুল ঠিকানা এবং পরে বাসা বদলে ফেলার কারনে তাদের পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পাওয়াও আর সম্ভব হয়নি। কিন্তু আজো সেসব ভালো হয়ে যাওয়া রোগীরা তাদের স্বজনের পথ চেয়ে অপেক্ষায় বসে আছে।একদিন হয়ত তাকে নিতে আসবে। বর্তমানে অবশ্য এভাবে বেনামে রোগী দিয়ে যাওয়া এত সহজ নয়। এখন ভর্তির সময়য় রোগীর এবং তার স্বজনের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং রোগীর সাথে রোগীকে যে নিয়ে এসেছে তার ছবি তুলে রখা হয়।
বাংলাদেশের সবচাইতে বড় মানসিক হাসপাতাল হচ্ছে পাবনার হেমায়েতপুরে কিন্তু মানসিক হাসপাতালে রোগীর তুলনায় চিকিৎসক এবং সেবিকার সংখ্যা একেবারেই কম। অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে মানসিক হাসপাতালে কাজ করতে চায়না। বিশেষ করে নার্স রা। কিন্তু যারা কাজ করছে তারা পেটের দায় ছাড়াও তাদের ভালো লাগা থেকেই কাজ করছে। আধুনিক চিকিৎসা এখনো অনেক বছর পিছিয়ে। মানসিক হাসপাতালে দরকার প্রচুর পরিমানে ফুল গাছ বা ফুলের বাগান যা একজন রোগিকে ভালো হয়ে উঠতে অনেক সাহায্য করে। কিন্তু আমি মানসিক হাসপাতাল ঘুরে সেরকম কিছুই দেখতে পাইনি। লোকবল এবং বাজেট ঘাটতির কারনে এসব আর সম্ভব হয়ে উঠেনা। তবে স্থানীয় লোকজনের মুখে অনেক দূর্নিতীর কথাও শুনেছি তবে এর সত্যতা যাচাই করতে আমি যাইনি।
আমি মনে করি মানসিক রোগও অন্য সব রোগের মত একটি রোগ। অন্য সব রোগের উন্নত চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক রোগেরও উন্নত চিকিৎসা খুব প্রয়োজন। সেই সাথে প্রয়োজন পরিবারের সদস্যদের সঠিক ভূমিকা। মানসিক রোগী যাতে বোঝা না হয়ে দাড়ায় প্রত্যেকের মাঝে এমন মানসিকতা তৈরী করা এবং এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া ভীষন জরুরি। আমাদের সমাজে ঘরে এবং বাইরে মানসিক রোগী দেখলে অনেক মজা করি। তাদের মেন্টাল, তার ছিড়া, স্ক্রু ঢিলা ইত্যাদি বলে তাদের উত্যক্ত করে থাকি। অনেক সময়য় রাস্তায় মানসিক রোগীদের ঢিল দেই। এ ধরনের কাজ যদি আমরা করেই যেতে থাকি তাহলে আমরা যে সৃষ্টির সেরা জীব সে গর্ব আর থাকলো কোথায়?